নিখোঁজ নাবিক স্বপন কুমার দাশ

প্রায় ২৪ বছর আগে চীন সাগরে ঘটেছিল এক রহস্যময় ঘটনা। ‘এমভি আল কাশিম’ নামের একটি জাহাজ বাংলাদেশের ২৪ জন নাবিকসহ নিখোঁজ হয়। দেশে-বিদেশে আলোড়ন তোলা সেই ঘটনা আজও রহস্যাবৃত। দীর্ঘ সময় পর ওই ঘটনা অনুসন্ধানে নেমেছেন জাহাজটির এক নাবিকের ছেলে।

জাহাজটির দ্বিতীয় কর্মকর্তা ছিলেন চট্টগ্রামের স্বপন কুমার দাশ। জাহাজটি নিখোঁজের সময় স্বপন কুমারের বড় ছেলে স্বপ্নীল দাশের বয়স ছিল ৫ বছর। তখন থেকেই স্বপ্নীল শুনে আসছেন, তাঁর বাবা সাগরে নিখোঁজ হয়েছেন।

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে বিবিএ করেছেন স্বপ্নীল। প্রায় ২৪ বছর পর তাঁর জেঠা দিলীপ কুমার দাশ তাঁর হাতে কিছু কাগজ তুলে দেন, যেখানে আছে সেই সময়কার ঘটনার কিছু নথি। সেই কাগজপত্র দেখে স্বপ্নীল সিদ্ধান্ত নেন, বাবার নিখোঁজের রহস্যের অনুসন্ধান করবেন তিনি। এরপরই জাহাজটির নিখোঁজ অন্য নাবিকদের পরিবারের সন্ধান শুরু করেন। চিঠি দেন নৌপরিবহন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায়।

স্বপন কুমার দাশ চট্টগ্রামের মেরিন ফিশারিজ একাডেমি থেকে কোর্স শেষ করে প্রথমে ফিশিং ভেসেলে, পরে বাণিজ্যিক জাহাজে কর্মজীবন শুরু করেন। একাডেমির অষ্টম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি।

কাগজপত্র থেকে দেখা যায়, ১৯৯৫ সালের নভেম্বরে সিঙ্গাপুর থেকে জাহাজটিতে দ্বিতীয় কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন স্বপন কুমার। সিঙ্গাপুরভিত্তিক সিটাইম শিপিং প্রাইভেট লিমিটেডের স্থানীয় এজেন্সি খুলনার বেঙ্গল মেরিন লাইনসের মাধ্যমে তিনি এক বছরের চুক্তিতে জাহাজটিতে যোগ দেন। পণ্য নিয়ে জাহাজটি জাপানের উদ্দেশে রওনা হয়। তার আগেই ফিলিপাইন বা তাইওয়ানের উপকূলের কাছাকাছি জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঘটনার প্রায় ৪০ দিন পর পত্রিকায় জাহাজটির নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ বেরোয়। এটি তাইওয়ানের উপকূলে বা ফিলিপাইনের উপকূলে নিখোঁজ হতে পারে বলে খবরে উল্লেখ করা হয়। জাহাজটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন রবিউল ইসলাম। ক্যাপ্টেনসহ বেশির ভাগ নাবিকের বাড়ি সাতক্ষীরায়।

জাহাজটি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে রহস্য শুরু হয়। কারণ জাহাজ ডুবে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে সাধারণত দ্রুত বার্তা পাঠানো হয়, যাতে আশপাশের জাহাজ উদ্ধারে এগিয়ে আসে। তবে এমন কোনো বার্তা সেই জাহাজ থেকে আসেনি। জলদস্যুরা ধরে নিলেও মুক্তিপণ আদায় করত। সেটিও হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৯৯৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এক চিঠিতে নিখোঁজ নাবিকের বাবা বিজয় কৃষ্ণ দাশকে জানায়, জাহাজটির নিশ্চিত অবস্থান নিরূপণ করা যায়নি।

জাহাজ নিখোঁজের পাঁচ বছর পর সেই সময়কার একটি বিদেশি জাহাজের বাংলাদেশি ক্যাপ্টেন তখনকার সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরে একটি চিঠি দেন। সেই চিঠিতে ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম জানান, অস্ট্রেলিয়া থেকে পণ্যবাহী জাহাজ নিয়ে ফিলিপাইনের মিন্দানাও প্রদেশের ইলিগান বন্দরে যান তিনি। সেখানকার মিন্দানাও এলাকার মসজিদ ‘আবু বকর’–এর তত্ত্বাবধায়ক তাঁকে জানান, কাছাকাছি মুজাহিদদের একটি শিবিরে ৩০ জন বাংলাদেশি রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে নিখোঁজ জাহাজ আল কাশিম-এর নাবিকেরাও আছেন। তবে পরদিন তাঁদের জাহাজ বন্দর ত্যাগ করার কথা থাকায় বিষয়টি সত্যতা যাচাই করতে পারেননি তিনি।

ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম প্রথম আলোকে জানান, চিঠি দেওয়া ছাড়াও আল কাশিম জাহাজের নিখোঁজ নাবিকদের কয়েকজনের পরিবারকে জানিয়েছিলাম। এরপর কী হয়েছে, তা জানা নেই তাঁর। ফরিদুল আলম বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের উপসংরক্ষক।

এত দিন পরের ঘটনা জট খোলা যাবে কি না, জানতে চাইলে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক আগের ঘটনা হলেও আসলে জাহাজটির নাবিকদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা বের করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। স্বপন কুমারের ছেলে একটি চিঠি দেওয়ার পর থেকে ঘটনার খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। স্বপন কুমারের ছেলেও চেষ্টা করছেন।’

২৪ বছর আগের ওই ঘটনার পর ক্যাপ্টেন রবিউলের পরিবার ঘটনার খোঁজে নানা জায়গায় ধরনা দিয়েছিল। অনেক বছর পর্যন্ত নিখোঁজ নাবিকের পরিবারের সদস্যদের সেই চেষ্টা অব্যাহত ছিল। সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর হতাশ হয়ে অনেকের তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়। সেখান থেকে শুরু করলেন স্বপন কুমার দাশের ছেলে স্বপ্নীল দাশ।

বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর স্বপ্নীল দাশ মা ও বোনকে নিয়ে মামার বাড়ি বাঁশখালীতে বড় হয়েছেন। সেই সময়কার দুর্ঘটনার পর তাঁরা কোনো ক্ষতিপূরণও পাননি। স্বপ্নীল দাশ জানান, ‘বাবার ভাগ্যে কী ঘটেছিল, অন্তত সেই তথ্যটা জানতে চাই। বহু বছর পরও যদি বাবার সন্ধান মেলে…।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here